চড়ুইভাতি
-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
একদিন অপুর দিদি দুর্গা চুপি চুপি ৰলে, 'চড়ুইভাতি করৰি অপু?' জঙ্গলে ভরা ভিটার খানিকটা বন দুর্গা নিজের হাতে দা দিয়া কাটিয়া পরিষ্কার করিয়া ভাইকে বলিল, 'দাঁড়িয়ে দেখ, তেঁতুলতলায় মা আসছে কি না-আমি চাল বের করে নিয়ে আসি শিগগির করে।'
একটা ভালো নারকেলের মালায় দুই পলা তেল চুপি চুপি তেলের ভাঁড়টা হইতে বাহির করিয়া আনিয়া দুর্গা ভাইয়ের জিম্মা করিয়া বলিল, 'শিগগির যা, দৌড়ো অপু-সেইখানে রেখে আয়, দেখিস্ যেন গোরু-টোরুতে খেয়ে না ফেলে-'
চারদিক বনে ঘেরা। বাহির হইতে দেখা যায় না। খেলাঘরের মাটির ছোবার মতো ছোট্ট একটা হাঁড়িতে দুর্গা ভাত চড়াইয়া দিয়া ৰলিল, 'এই দেখ অপু, কত ৰড়ো ৰড়ো মেটে আলুর ফল নিয়ে এসিচি এক জায়গা থেকে, ভাতে দেৰ।'
অপু মহা উৎসাহে লতা-কাঠি কুড়াইয়া আনে। এই তাহাদের প্রথম বনভোজন। বড়ো সুন্দর স্থান বনভোজনের। চারিধারে বনঝোপ, ওদিকে তেলাকুচো লতার দুলুনি, বেলগাছের তলে,চড়ুই ভাতি
৩৭
জঙ্গলে শেওড়া গাছে ফুলের ঝাড়, আধ-পোড়া কচি দুর্বাঘাসের উপর খঞ্জনা পাখিরা নাচিয়া নাচিল্লা ছুটিয়া বেড়াইতেছে, নির্জন ঝোপঝাপের আড়ালে নিভৃত-নিরালা স্থানটি।
চড়ুইভাতির মাঝামাঝি অপুদের বাড়ীর উঠানে কাহার ডাক শোণা গেল। দুর্গা বলিল, 'বিনির গলা যেন, নিয়ে আয় তো ডেকে অপু।' একটু পরে, অপুর পিছনে পিছনে দুর্গার সমবয়সি একটি কালো মেয়ে আসিল-একটু হাসিয়া যেন কতক সম্ভ্রমের সুরে বলিল, 'কী হচ্ছে দুগ্গা দিদি?'
দুর্গা বলিল, 'আয় না বিনি, চড়ুইভাতি কচ্চি, বোস্।'
বিনি দুর্গার ফাইফরমাজ খাটিতে লাগিল খুব। বেড়াইতে আসিয়া সে যেন হঠাৎ খুব লাভজনক ব্যাপারের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। দুর্গা বলিল, 'বিনি, আর দুটো শুকনো কাঠ দেখ তো, আগুনটা ভালো জ্বলছে না।' বিনি তখনই কাঠ আনিতে ছুটিল এবং একটু পরে এক বোঝা শুকনো বেলের ডাল আনিয়া হাজির করিয়া বলিল, 'এতে হবে দুগ্গা দিদি-না, আরও আনব? মো 25
দুর্গা যখন বলিল-'বিনি এসেছে, ও-ও তো এখানে খাবে, আর দুটো চাল নিয়ে আয় অপু'-বিনির মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। খানিক পরে বিনি জল আনিয়া দিল। আগ্রহের স্বরে
জিজ্ঞাসা করিল, 'কী কী তরকারি দুগ্গা দিদি?'
ভাত নামাইয়া, দুর্গা ছোবাতে তেলটুকু দিয়া, বেগুন ফেলিয়া ভাজে। অপুকে ডাকিয়া অবাক সুরে বলে, 'ঠিক একেবারে সত্যিকারের বেগুন ভাজার মতন রং হচ্ছে, দেখছিস অপু!'
অপুরও ব্যাপারটা আশ্চর্য বোধ হয়। যেন বিশ্বাস হয় না, তাহাদের বনভোজনে সত্যিকারের ভাত, সত্যিকারের বেগুন-ভাজা সম্ভবপর হইবে। তাহার পর তাহারা মহা আনন্দে কলার পাতে খাইতে বসে। অপু বলে, 'বেশ হয়েছে দিদি, কিন্তু নুন হয়নি যেন।' মহা খুশিতে তিন জনে কোষো মেটে আলুর ফল ও পানসে আধ-পোড়া বেগুনভাজা দিয়া চড়ুইভাতির ভাত খাইতে বসিল। দুর্গার এই প্রথম রান্না, বিস্ময়মেশানো আনন্দের সঙ্গে নিজের হাতের শিল্পসৃষ্টি উপভোগ করিতেছিল।
খাইতে খাইতে অপুর দিকে চাহিয়া হিহি করিয়া খুশির হাসি হাসিল।
আনন্দ! আনন্দ! আজকের আনন্দ! সামান্য সামান্য ছোটোখাটো তুচ্ছ জিনিসের আনন্দ!
অপু বলিল, 'মাকে কী বলৰি দিদি? আবার ও বেলা ভাত খাবি?'
'দূর! মাকে কখনও বলি? সন্ধ্যের পর দেখিস, খিদে পাবে তখন।'
খাওয়া-দাওয়া হইয়া গেলে দুর্গা বলিল, 'হাঁড়ি ফেলা হবে না কিন্তু। আবার আরেক দিন
বনভোজন করব, কেমন তো? ওই কুলগাছটার ওপর টাঙিয়ে রেখে দেব!'
অপু বলিল, 'না রে দিদি, কেউ দেখতে পেলে নিয়ে যাবে।'
একটা ভাঙা পাঁচিলের ঘুলঘুলির মধ্যে ছোবাটা দুর্গা রাখিয়া দিল
17
SNVA
No comments:
Post a Comment