Thursday 03 2025

পেটুক সুকুমার রায়

পেটুক

সুকুমার রায়




'হরিপদ, ও হরিপদ'।

হরিপদর আর সাড়াই নেই। সবাই মিলে এত চেঁচাচ্ছে, হরিপদ আর সাড়াই দেয় না। কেন, হরিপদ কালা নাকি? কানে কম শোণে বুঝি? না, কম শুণবে কেন-বেশ দিব্যি পরিষ্কার শুণতে পায়। তবে হরিপদ কি বাড়ি নেই? তা কেন? হরিপদ মুখভরা ক্ষীরের নাড়ু ফেলতেও পারে না, গিলতেও পারে না। কথা বলবে কী করে? আবার ডাক শুণে ছুটে আসতেও পারে না- তা হলে যে ধরা পড়ে যাবে। তাই সে তাড়াতাড়ি নাড়ু গিলছে আর জল খাচ্ছে, আর যতই গিলতে চাইছে ততই গলার মধ্যে নাড়ুগুলো আঠার মতো আটকে যাচ্ছে। বিষম খাবার যোগাড় আর কি!

এটা কিন্তু হরিপদর ভারি বদভ্যাস। এর জন্য কত ধমক, কত শাসন, কত শাস্তি, কত সাজাই যে সে পেয়েছে, তবু তার আক্কেল হল না। তবু সে লুকিয়ে চুরিয়ে পেটুকের মতো খাবেই। যেমন হরিপদ তেমনি তার ছোট ভাইটি। এদিকে পেট রোগা, দু'দিন অন্তর অসুখ লেগেই আছে, তবু হ্যাংলামি তাদের আর যায় না। যেদিন শাস্তিটা একটু শক্ত রকমের হয়, তারপর কয়েক দিন ধরে প্রতিজ্ঞা থাকে, " এমন কাজ আর করব না"। যখন অসময়ে অখাদ্য খেয়ে রাত্রে তার পেট কামড়ায়, তখন কাঁদে আর বলে, "আর না, এইবারেই শেষ"। কিন্তু দু'দিন না যেতেই আবার যেই কে সেই।
এই তো কিছুদিন আগে পিসিমার ঘরে দই খেতে গিয়ে জব্দ হয়েছিল, কিন্তু তবু তো লজ্জা নেই। হরিপদর ছোট ভাই শ্যামাপদ এসে বললে, "দাদা, শিগগির, এসো। পিসিমা এইমাত্র এক হাঁড়ি দই নিয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে রাখলেন।" দাদাকে এত ব্যস্ত হয়ে এ খবরটা দেবার অর্থ এই যে পিসিমার ঘরে যে শিকল দেওয়া থাকে, শ্যামাপদ সেটা হাতে নাগাল পায় না- তাই দাদার সাহায্য দরকার হয়। দাদা এসে আস্তে আস্তে শিকলটা খুলে আগেই তাড়াতাড়ি গিয়ে খাটের তলায় দই-য়ের হাঁড়ি থেকে এক খাবলা তুলে নিয়ে 'খপ্ করে মুখে তুলে দিয়েছে। মুখে দিয়েই চিৎকার। কথায় বলে 'খাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছে', কিন্তু হরিপদর চেঁচানো তার চাইতেও সাংঘাতিক। এদিকে হরিপদর অবস্থা দেখে পিসিমা বুঝেছেন যে হরিপদ দই ভেবে তাঁর চুনের হাঁড়ি চেখে বসেছে। তারপর হরিপদর যা সাজা। এক সপ্তাহ ধরে সে না পারে চিৰোতে, না পারে গিলতে। কিন্তু তবু তো তার লজ্জা নাই! আজ আবার লুকিয়ে কোথায় নাড়ু খেতে গিয়েছে। ওদিকে মামা তো ডেকে ডেকে সারা।

খানিক বাদে মুখ ধুয়ে মুছে হরিপদ ভালো মানুষের মতো এসে হাজির। হরিপদর বড় মামা বললেন, "কি রে, এতক্ষণ কোথায় ছিলি?" হরিপদ বললো, "এই তো, উপরে ছিলাম।" "তবে আমরা এত চেঁচাচ্ছিলাম, তুই জবাব দিচ্ছিলি না যে?" হরিপদ মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললো-"আজ্ঞে, জল খাচ্ছিলাম কি না।" "শুধু জল? না, কিছু স্থলও ছিল?" হরিপদ শুণে হাসতে লাগলো যেন তার সঙ্গে - ভারি একটা রসিকতা করা হয়েছে। এর মধ্যে তার মেজ মামা মুখখানা গম্ভীর করে এসে হাজির। তিনি ভিতর থেকে খবর এনেছেন যে হরিপদ একটু আগেই ভাঁড়ার ঘরে ঢুকেছিল, আর তার পর থেকেই প্রায় দশ বারোখানা ক্ষীরের নাড়ু কম পড়েছে। তিনি এসেই হরিপদর বড় মামার সঙ্গে খানিকক্ষণ ইংরাজিতে ফিসফাস কী-যেন বলাবলি করলেন, তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, "বাড়িতে ইদুরের যে রকম উৎপাত, ইঁদুর মারবার একটা কিছু বন্দোবস্ত না করলে আর চলছে না। চারিদিকে যে রকম প্লেগ ও ব্যারাম! এই পাড়াসুদ্ধ ইঁদুর না মারলে আর রক্ষে নেই।" বড় মামা বললেন, "হ্যাঁ, তার ব্যবস্থা হয়েছে। দিদিকে বলেছি সেঁকো বিষ দিয়ে নাড়ু পাকাতে-সেইগুলো একবার ছড়িয়ে দিলেই ইঁদুর বংশ নির্বংশ হবে।"

হরিপদ জিজ্ঞেস করলো, "নাড়ু কৰে পাকানো হবে?" বড় মামা বললেন, "সে এতক্ষণে হয়ে গেছে, সকালেই টেপিকে দেখছিলাম এক থাল ক্ষীর নিয়ে দিদির সঙ্গে নাড়ু পাকাতে বসেছে"। হরিপদর মুখখানা আমসির মত শুকিয়ে এল। সে খানিকটা ঢোঁক গিলে বললো, "সেঁকো বিষ খেলে কী হয় বড় মামা?" "হবে আবার কী! ইঁদুরগুলো মারা পড়ে, এই হয়। আর যদি মানুষ এই নাড়ু খেয়ে ফেলে?” “তা একটু আধটু যদি খেয়ে ফেলে তো নাও মরতে পারে-গলা জ্বলবে, মাথা ঘুরবে, বমি হবে, হয়তো হাত-পা খিঁচবে।" "আর যদি একেবারে এগারটা নাড়ু খেয়ে ফেলে?" বলে, হরিপদ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো। তখন বড় মামা হাসি চেপে অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, "বলিস কি রে। তুই খেয়েছিস নাকি?" হরিপদ কাঁদতে কাঁদতে বললো, "হ্যাঁ বড় মামা, তার মধ্যে পাঁচটা খুব বড় ছিল। তুমি শিগগির ডাক্তার ডাক বড় মামা, আমার কী রকম গা ঝিমঝিম বমি বমি করছে।



No comments:

Post a Comment

Greek civilization exercise answer । Ananda Marga school class 4 history Greek civilization question

1. Answer the following questions: • a) Where was Asia Minor? 👉 Asia Minor was located to the north-west of India. • b) Wha...